লিখি তাই বেঁচে আছি/ কিঙ্কর আহ্সান

Google+ Pinterest LinkedIn Tumblr +

[কিঙ্কর আহ্সান। তরুণ ঔপন্যাসিক ও গল্পকার। ভালোবাসেন গল্প বলতে। মনেপ্রাণে চান, এ পৃথিবী গল্পের হোক। আর এই গল্প বলার নেশার কারণেই বেছে নিয়েছেন বিজ্ঞাপনের সুতোয় গল্প বলার কাজ। কাজ করছেন এখন Asiatic JWT তে। দেশের আরো অনেক প্রতিষ্ঠিত অ্যাড  এজেন্সিতে কাজ করেছেন। এ বছর অমর একুশে বইমেলা ২০১৮ এ প্রকাশিত হয়েছে তার উপন্যাস ‘ রাজতন্ত্র ‘। ইতিমধ্যে বইটির ২য় সংস্করণ চলছে। ওয়াটারমেলন এন্ড আদার্সের পক্ষ থেকে, অসাধারণ এই লেখককে অনুরোধ করা হয়েছিলো, তার নিজের লেখালেখি বিষয়ক একটি গদ্যের জন্য। প্রিয় পাঠক আসুন, একজন তরুণ ও জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিককে জানার চেষ্টা করি। আর জেনে নেই তার লেখালেখি বিষয়ক ভাবনাগুলো।]

আমি মূলত একজন পাঠক। পড়ে আমি শান্তি পাই। বিশ্বাস করি, অনেক অনেক বই পড়লে একটা লাইন লিখবার সাহস করতে পারে একজন লেখক। বই প্রকাশের আগে টানা ছয় বছর বিভিন্ন পত্রিকায় লিখেছি। ‘প্রথম আলো’ থেকে লেখালেখির শুরু। আমরা যারা লিখতাম তারা বিভিন্ন বই পড়ে তাই নিয়ে আলাপ করতাম। তর্ক হতো। ‘কালের কন্ঠ’ পত্রিকায় সাব এডিটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি কিছুদিন। তখন থেকে বিভিন্ন পত্রিকায় ছোট গল্প লিখে পাঠানো শুরু হয়। বাংলা নিউজ ২৪ ডট কম, বাংলাদেশ প্রতিদিনসহ প্রায় সকল দৈনিক পত্রিকায় টানা লিখে গিয়েছি। ছাপার অক্ষরে নিজের নাম দেখার লোভ সামলাতে পারতাম না। লিখতে লিখতে একটা ছোট্ট পাঠকগোষ্ঠী তৈরি হয়ে গিয়েছিলো। অনেকেই বলছিলো বই নিয়ে আসবার জন্য। নিজে সাহস পাচ্ছিলাম না। সাহস দিতে আসে বন্ধুরা আর প্রকাশক। জাগৃতি প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয় আমার প্রথম উপন্যাস ‘আঙ্গারধানী’ এবং ‘কাঠের শরীর’। খুব ভাগ্যবান ছিলাম বলেই বই দুটো ভালো বিক্রি হয়েছিলো। ভালো বলতে প্রকাশককে লোকসানের মুখোমুখি হতে হয়নি। তিনি খুশি ছিলেন।

আমার নিজের বই নিয়ে কথা বলতে ভালো লাগতো না। মনে হতো লেখাটাই সবচেয়ে জরুরী। ভালো লিখলে পাঠক খুঁজে নেবে ঠিক ঠিক। এই চুপচাপ, নীরবে থেকেই পরের বছর লিখে ফেলি আরো দুটো বই। উপন্যাস রঙিলা কিতাব এবং গল্পগ্রন্থ স্বর্ণভূমি আসার পর আমার পাঠক বেড়ে যায় আরো। তবে সংখ্যাটা আহামরি কিছু নয়। যারা পত্রিকায় আমার নাম দেখেছে, আমার লেখার সাথে পরিচিত তারাই মূলত আমার বইগুলো কিনতো। যারা বই পড়ে তারা কিছু ইন্ট্রোভার্ট হয়। বই পড়ে সেই বই নিয়ে আর কথা বলতে চায় না। রেখে দেয় বুকশেলফ্ এ। অথচ বই নিয়ে কথা বললে, বইয়ের ছবি কোথাও দিলে বইয়ের কথা ছড়িয়ে পড়ে। বইয়ের পাঠক বাড়ে। একজনেরটা দেখে দশজন বই পড়তে আগ্রহী হয়। বাইরের দেশের অনেকের ফেসবুক আর ইন্সটাগ্রাম অ্যাকাউন্টে গিয়ে দেখা যায় ট্রেনে, বাসে যাবার পথে বই পড়ছে এমন ছবি আপলোড দেওয়া। দেখা যায় স্টারবাকস্ কফির পাশে পেপারব্যাক বই রেখে ছবি দিচ্ছে কিন্তু আমাদের এমনটা দেখা যায় না। রেস্টুরেন্টে বসে যত চেক ইন দেওয়া হয় তার অর্ধেকেরও অর্ধেক লোক কখনও বই পড়ছি এই নিয়ে ফেসবুক, ইন্সটাগ্রাম এমন কোথাও লেখেনা। লেখকরাও একজন আরেকজনকে নিয়ে কথা বলে না। ইগোর খামার হয়ে লাইক আর ফলোয়ার গোনায় ব্যস্ত অনেকেই। বই তাই গ্ল্যামার হারায়। লেখক আর পাঠকের দূরত্ব বাড়তেই থাকে। এইসবের ভেতরেই আরো দুটো বই আনি আমি। উপন্যাস মকবরা এবং আলাদিন জিন্দাবাদ। ছোট গল্প লিখতেই বেশি ভালো লাগে আমার। তবে ছোট গল্পের পাঠক কম। প্রতিবছর দুটো করে বই এনেছি শুরুর দিকে। কিন্তু অফিসে কাজের চাপ, পরিবারের দেখাশোনা এইসব দায়িত্বের কারণে লেখার সময়টা কমতে থাকে ধীরে ধীরে। বেঁচে থাকার জন্য অন্য কাজ করতে হয় কিন্তু ভালো লাগার, ভালোবাসার জায়গা শুধুমাত্র লেখালেখি। তাই সময় পেলেই লিখতে বসে যাই। আমি বই পড়ে নিঃশ্বাস নেই আর লেখার জন্য বাঁচি।

যেহেতু লিখে জীবন চলে না তাই লেখালেখি চালিয়ে যাওয়াই আমার জন্য একটি সংগ্রাম। আমার সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আসা বই ‘মধ্যবিত্ত’। মূলত এই বইয়ের সময় থেকেই আমি নিজের লেখা নিয়ে সরব হই। অনলাইন বুকশপ ‘রকমারি’ সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসে। রেডিও, পত্রিকা, ফেসবুক সবজায়গায় গিয়ে আমি এই বইটার কথা বলেছি। সবাই জানবার পর বেড়ে যায় বইটার বিক্রি। দারুণ, দারুণ সব রিভিউ আসতে শুরু করে। মানুষ নিজ নিজ জায়গা থেকে কথা বলে ‘মধ্যবিত্ত’ বইটা নিয়ে। এই বইয়ের পর আমার পুরনো বইগুলোর বিক্রিও বেড়ে যায় কয়েকগুণ। ধীরে ধীরে আমাকে নিয়ে সবার আগ্রহ বাড়ে। প্রকাশকরাও আগ্রহী হয়ে ওঠে আমার মতন সামান্য লেখককে নিয়ে। বইমেলা ছাড়া আমাদের দেশে বই তেমন একটা প্রকাশিত হয় না। বই নিয়ে আলোচনাও হয় না। আমি মাঝে মাঝে বলি, প্রতিটি মাসই ফেব্রুয়ারি হোক। বই বের হোক। বই নিয়ে কথা হোক। বইয়ের চেয়ে প্রবল শক্তি আর কিছুর নেই। একটা প্রজন্ম বই ছাড়া বেড়ে উঠবে এটা মানতে রাজি নই। চাকরির প্রচন্ড কাজের চাপের পরেও বই নিয়ে কাজ শুরু করি আমি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ড্যাফোডিল ইউনিভার্সিটিসহ নানান শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গিয়ে বই নিয়ে, গল্পের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কথা বলি। দারুণ সাড়া পাই এতে। বইমেলা ছাড়াই বছরের মাঝামাঝি ‘কিস্সাপূরণ’ নামে একটা বই প্রকাশ করি এসময়ে। ভালো বিক্রি হয়। তবে এই সময়ে খেয়াল করি ঢাকার বাইরে অনলাইন বুকশপগুলো ছাড়া বই পৈাঁছানোর আর কোনো উপায় নেই। বই একদমই সহজলভ্য নয়। নির্দিষ্ট কয়েকজন লেখকের বাইরে আর কারো বই পাওয়া যায় না জেলা শহরগুলোতে। ঢাকার বাইরে চট্টগ্রাম, রাজশাহী, বরিশাল এসব জায়গায় অনেক পাঠক থাকলেও তারা বই কিনতে পারছে না সহজে। এক্ষেত্রে অনলাইন বুকশপ রকমারি, বই পোকা ডট কম, আরন্যক এবং বিবিধই একমাত্র সমাধান। কিন্তু অনলাইন ছাড়া দোকানে গিয়ে যারা বই কিনতে চান তাদের পক্ষে কাছের দোকানে গিয়ে বই কেনা সম্ভব হচ্ছে না। আমার মনে হয় বই সহজলভ্য হওয়া উচিত। প্রচুর লাইব্রেরি আর বইয়ের দোকান থাকা দরকার। সেখানে সব ধরনের লেখকের বই আসা প্রয়োজন।

বইমেলা ২০১৮ তে আমি প্রকাশ করি উপন্যাস ‘রাজতন্ত্র’। সমাজের উঁচুতলার মানুষের জীবনে থাকা সুখ, দুঃখ, ভালো লাগা, মন্দ লাগা নিয়ে এই উপন্যাস। তবে কাহিনীর প্রয়োজনে কখনো এসেছে মানিকগঞ্জের দুখী ঢোল বাদক যশোরথের কথা আবার এসেছে অরুনাচলের নিনং এরিং এর কথা। দিনের পর দিন না ঘুমিয়ে, ভাঙা হাত নিয়ে, নানান যন্ত্রনার ভেতরে থেকে এই উপন্যাস এনেছি এই মেলায়। আমার জন্য অনেক কঠিন একটা বছর ছিলো ২০১৭। একমাত্র ‘রাজতন্ত্র’ আমাকে দু দন্ড শান্তি দিয়েছে। মেলার শুরু থেকেই সবাই কথা বলছে বইটা নিয়ে। আমি কৃতজ্ঞ। মানুষের হাতে হাতে বই। এই দৃশ্য আনন্দ দেয়। একটা বইয়ের পৃথিবীর স্বপ্ন দেখি আমি। ব্যক্তিগত জীবনে বিজ্ঞাপনী এজেন্সিতে কাজ করা এই আমি সবসময়েই পৃথিবী গল্পের হোক, বইয়ের হোক।

১৭ কোটি মানুষের দেশে ৩০০ কপি বই বিক্রি হলেই সেই লেখককে জনপ্রিয় ধরা হয়া। লোকসান হলো না দেখে প্রকাশক খুশি হন। আমার মনে হয় ৩০০ কপি নয় ৩ লাখ, ৩ কোটি কপি বিক্রি হওয়া দরকার। মানুষ সত্যিকারের মানুষ হয়ে ওঠে বইয়ের মধ্য দিয়ে। যে বই পড়ে সে সবচেয়ে বেশি এগিয়ে থাকা মানুষ। বইপড়–য়া মানুষরা সাধারন নন, তারা অসাধারন তাই বই নিয়ে সবচেয়ে বেশি আওয়াজ হওয়া দরকার। সবচেয়ে জরুরী বিষয় হিসেবে আলোচনা হওয়া দরকার। এই শো অফ আর অস্থির জীবন দেখে মনে হয় মানুষ একদিন বইয়ের কাছে ফিরবে। তাকে, তাদের ফিরতেই হবে। কারণ বই মানেই শান্তি। শান্তি মানেই বই। এই নিয়ে কোনো তর্ক নেই। তর্ক হতে পারেনা। কোনোভাবেই না।

Share.

About Author

কিঙ্কর আহ্সান

কথাসাহিত্যিক।

Leave A Reply

error: Content is protected !!