নিরাপদ ইন্টারনেট ও রবির সেইফনেট ক্যাম্পেইন

Google+ Pinterest LinkedIn Tumblr +

৬ ফেব্রুয়ারী। সারাবিশ্বে এই দিনটি নিরাপদ ইন্টারনেট দিবস হিসেবে পালিত হয় । এ বছর [২০১৮] ইউনিসেফ, নিরাপদ ইন্টারনেট দিবসে, ডিজিটাল মাধ্যমে শিশুদের পদচারণা সুরক্ষিত রাখতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে আহবান জানিয়েছে। ইউনিসেফের তথ্যমতে, প্রতিদিন  ১ লাখ ৭৫ হাজারেরও বেশি শিশু অনলাইন জগতে প্রবেশ করছে। এবং প্রতি ৩০ সেকেন্ডে ১জন শিশু জীবনের প্রথমবারের মতো অনলাইনে ঢুকছে। এ সম্পর্কে, ইউনিসেফের ওয়েবসাইটে বলা হচ্ছে,

জাতিসংঘের শিশুবিষয়ক সংস্থাটি সতর্ক করে জানিয়েছে, ডিজিটাল দুনিয়ায় এই প্রবেশ তাদের সামনে উপকার ও সুযোগের বিশাল দ্বার উন্মোচন করে। তবে একই সঙ্গে তাদের ঝুঁকি ও ক্ষতির মুখেও ফেলে, যার মধ্যে রয়েছে ক্ষতিকর আধেয় [কনটেন্ট], যৌন হয়রানি ও শোষণ, সাইবার উৎপীড়ন ও তাদের ব্যক্তিগত তথ্যের অপব্যবহার।

ইউনিসেফের ডাটা রিসার্চ ও পলিসি বিভাগের পরিচালক লরেন্স চ্যান্ডি বলেন, “প্রতিদিন হাজার হাজার শিশু প্রথমবারের মতো অনলাইনে যাচ্ছে, যা তাদের জন্য ব্যাপক বিপদের দ্বার উন্মুক্ত করে। অথচ বিপদগুলো চিহ্নিত করার বদলে আমরা কেবল মূল্যায়নই করে যাচ্ছি।  অনলাইনে সবচেয়ে ভয়াবহ ঝুঁকিগুলো দূর করার জন্য নীতিমালা প্রণয়নে সরকার ও বেসরকারি খাতগুলো অবশ্য কিছু অগ্রগতি অর্জন করেছে। তবে শিশুদের অনলাইন জীবনকে সম্পূর্ণরূপে বুঝতে ও তা সুরক্ষিত করার জন্য আরো পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।”

ইউনিসেফের এই গবেষণা সময়োচিত। কেননা ইন্টারনেট ব্যবহারকারী শিশুদের মানসিক বিকাশের জন্যেও জরুরি বিষয়টি। এই নিউজটি যখন বিবিসিইউনিসেফ-বাংলাদেশ-এর ওয়েবসাইটে পড়ছি আমরা, তারও মাস খানেক আগে থেকেই [৩রা জানুয়ারি ২০১৮ অনএয়ার হয় এই বিজ্ঞাপনটি] বাংলাদেশের টিভি ও অনলাইনে ভেসে বেড়াচ্ছিল বাংলাদেশের অন্যতম মোবাইল অপারেটর রবির একটা ভাইরাল ভিডিও। সে ভিডিওতে দেখা যায়, কয়েকজন ছোট ছোট ছেলেমেয়ে, শেয়ার করছে, ইন্টারনেট থেকে তারা কে কী শিখেছে?

তারা কেউ গান শিখেছে। আযান শিখেছে। কেউ ফ্রেঞ্চ ভাষা শিখেছে। তিন ভাই মিলে বাবার জুতার বাক্সো দিয়ে প্রজেক্টর বানানো শিখেছে। কেউ মিথ্যামিথ্যি গিটার বানানো শিখেছে বলেছে। কেউ কাটলেট, কেউ ম্যাজিক শিখেছে। কেউ ডান্স শিখেছে। কেউবা শিখেছে ১৯ রকমের গালি। আর কেউ বলছে, সে ইন্টারনেট থেকে শিখেছে বোম বানানো।

ভিডিওটা দ্রুতই ভাইরালে পরিণত হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনপ্রিয়তা পায় খুব। বাঁধাহীন ও অবারিত ইন্টারনেটে যে কারো শিশু সন্তান নিরাপদ নয়, এই ম্যাসেজটাও খুব সাবলীলভাবে ক্যারি করতে পেরেছে বিজ্ঞাপনটি। খুব কার্যকর একটা ম্যাসেজ সোসাইটিতে সহজেই ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হয় বিজ্ঞাপনটা। বিজ্ঞাপনটি নির্মাণ করেন, ম্যাজিকম্যান মোস্তফা সরয়ার ফারুকী। আর ক্রিয়েটিভ ডিরেক্টর হিসাবে কাজ করেন আরেক বিখ্যাত ক্রিয়েটিভ ডিরেক্টর তানভীর হোসেন। আর এজেন্সি সান কমিউনিকেশন। তখনো বুঝা যায়নি যে, ভিডিওটা রবির সেইফনেট ক্যাম্পেইনের-ই অংশ ।

২.

ভাইরাল ভিডিওটির প্রচারের বেশ কিছুদিন পর, রবির মূল বিজ্ঞাপনটা অনএয়ার হয় [জানুয়ারির শেষদিকে]। প্রচারের সঙ্গে সঙ্গে টিভিসিটা জনপ্রিয়তা পায় খুব। এর অসাধারণ কন্টেন্ট ও নির্মাণের জন্য। কাহিনীটা এমন যে একটা পিচ্চি মেয়ে রেলস্টেশন হতে অজানা আগ্রহ ও বিস্ময়ে বিভোর হয়ে অন্য দিকে চলে যায়। প্রথমে একটা লাইব্রেরিতে ঢুকে পড়ে সে। সেখান থেকে রাস্তা, ফুটওভারব্রিজ হয়ে বাজারে। তার আশেপাশে দেহ ব্যবসা, জুয়ার কারবারি। আর আমরা ভিডিওতে দেখি অচেনা পরিবেশে বাচ্চা মেয়েটার হতবিহ্বল ও করুণ মনোজগত ও চাহনি! এভাবে সন্ধ্যা নেমে আসে। বিজ্ঞাপনটার শেষে ভয়েসওভারে বলা হয়, ‘আমাদের সন্তানকে কি কোথাও আমরা একা ছাড়ি, তাহলে ইন্টারনেটে কেন ছাড়বো?’ 

মূলত রবির সেইফনেট ক্যাম্পেইনটির প্রচারের জন্য নির্মিত বিজ্ঞাপনটি অসাধারণ। কপি, ডিরেকশন সবই তাক লাগানো। বাচ্চা মেয়েটার অভিনয়ও দুর্দান্ত হয়েছে। কোনো ক্যাম্পেইনের আলো ছড়ানোর জন্য একটা সফল বিজ্ঞাপন বুঝি এমনই হয়।

আর এজেন্সি মূল বিজ্ঞাপনটির আগে, ভাইরাল ভিডিও নির্মাণ করে ক্যাম্পেইনটাকে আরো আকর্ষনীয় করে তুলা হয়েছে। ভাইরাল ছাড়াও আরো ৬টি ভিডিও কন্টেন্ট প্রচারিত হয়েছে ইতিমধ্যে রবির সেইফনোটের ওপর। দুইজন কর্মজীবী মা [তাসমিয়াহ নুহিয়া আহমেদ ও মাহিমা মারিয়াম], বিখ্যাত টিভি প্রেজেন্টার নাভিদ মাহবুব ও গায়িকা মেহেরীন, অভিনেত্রী দীপা খন্দকার ও বিজরী বরকতুল্লাহকে নিয়ে নির্মিত ভিডিও ৬টিতে সন্তানদের জন্য নিরাপদ ইন্টারনেট নিয়ে কথা বলতে দেখা যায় তাদের। সান কমিউনিকেশনের অসাধারণ প্ল্যানিং ও ডিজাইন ক্যাম্পেইনটিকে দুর্দান্ত সফল করে তুলেছে এবং প্রতিটি ভিডিও কন্টেন্টই জনপ্রিয় হয়েছে।

এই ক্যাম্পইনের জনপ্রিয় ভিডিও দুটির নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী ফেসবুক পেইজে, এ প্রসঙ্গে লেখেন,

“আমার ভাগ্নে রিদওয়ান। বয়স পাঁচ। সারাদিন ইউটিউবে পড়ে থাকে। সে মূলত কার্টুনই দেখে। কিন্তু একদিন সে যে শেয়ারড ডিভাইস ব্যবহার করে সেটা ঘাটতে গিয়ে দেখি সেখানে সাজেশানে সানি লিওন এবং ইত্যাকার কিছু ভিডিও সাজেস্ট করছে। আমি জানি সে এগুলা দেখেনা, হয়তো অন্য কেউ দেখেছে, তাই সাজেশন আসছে। আবার এটাও জানি বয়স হইলে সে সবই দেখবে। কিন্তু আমি এটা ভেবে দুশ্চিন্তায় পড়লাম যে বয়সের আগেই যদি সে ঐসব কনটেন্টের সাক্ষাত পায় তাহলে তার স্বাভাবিক বিকাশে একটা অপ্রত্যাশিত ঢেউ আসবে। এটা নিয়ে মোটামুটি আমি কিছুদিন আতংকে আছি।

এইসময় সান কমিউনিকেশনের Tanvir Hossain ভাইয়ের ফোন। তিনি জানালেন রবির একটা বিজ্ঞাপন করতে হবে। আমি গল্প শুনেই লাফাইয়া উঠলাম। বললাম শুধু বিজ্ঞাপন না, আমি ভাইরালটাও করতে চাই। ভাইরালটা ইতিমধ্যেই আপনারা দেখেছেন। আর এটা হইলো মূল বিজ্ঞাপন।

রবিকে ধন্যবাদ এই রকম খুব প্রয়োজনীয় একটা প্রডাক্ট নিয়ে আসার জন্য। খুব খুব সময়োপযোগী। প্রদীপ, Sharoz Ashraf এবং ব্র্যান্ডয়ের ভাই বোনদের ভালোবাসা।”

ভিডিও কন্টেন্ট ছাড়াও, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জন্য তৈরি করা হয়েছে ইনফোগ্রাফি। এছাড়াও নিরাপদ ইন্টারনেট ব্যবহার ও সেইফনেটের বিস্তারিত জানাবার জন্য, রবি জনপ্রিয় এফএম রেডিওগুলোর [এবিসি, রেডিও ফূর্তি, ভূমি, রেডিও নেক্সট] ফেসবুক পেইজে লাইভ শো আয়োজন করছে।

৩.

গ্রাহকের সমস্যার দিকে চোখ রেখে কোনো প্রোডাক্টের ডিজাইন হলে, সে প্রোডাক্টের জনপ্রিয়তার জন্য কাঠখড় পোড়াতে হয় না। রবির সেইফনেট ক্যাম্পেইন তার উজ্জ্বল প্রমাণ। রবির ম্যানেজমেন্ট শিশুদের ইন্টারনেট ব্যবহারের সমস্যাটা [বা নিরাপদ ইন্টারনেট ব্যবহারের বিষয়টা] ক্যাচ ও ক্যাশ করতে পেরেছে একদম সময়মতো।  আর প্রোডাক্টের ডিজাইনও করেছে খুব রেসপন্সিভ ওয়েতে। সেইফনেটের বৈশিষ্ট সম্পর্কে রবির ওয়েবসাইটে বলা হচ্ছে:

  সময় ভিত্তিক ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণ

  বিশেষ ক্যাটেগরির সাইট ব্লক করা/খুলে দেওয়া

  তালিকাভূক্ত অ্যাপ/ইউআরএল ব্লক করে রাখা

এই বৈশিষ্টগুলোর কারণে, খুব সহজেই রবির যে কোনো গ্রাহক অবারিত ইন্টারনেটের অযাচিত কিছু কন্টেন্ট থেকে তার শিশু সন্তানকে নিরাপদ রাখতে পারবেন। আশা করা যায়, ক্যাম্পেইনটি তার গ্রাহকের সমস্যার সমাধান করে, ব্যবসা সফল হয়ে উঠবে।

বাংলাদেশে সেইফনেটের কনসেপ্ট প্রথম ইন্ট্রুডিউস করা ও একইসঙ্গে শিশুদের জন্য নিরাপদ ইন্টারনেট ব্যবহারের  সুযোগ করে দেয়ার জন্য, রবি কর্তৃপক্ষকে ওয়াটারমেলন-এর পক্ষ থেকে স্যালুট জানাতে চাই আমরা!


দোহাই:

১. ইউনিসেফ বাংলাদেশের ওয়েবসাইট: ‘ইন্টারনেটের ব্যবহার শিশুদের জন্য সুযোগ সৃষ্টির পাশাপাশি ঝুঁকিও বাড়ায়’।
২. বিবিস নিউজ: ‘অনলাইন ব্যবহারে শিশুদের ঝুঁকি বাড়ছে: ইউনিসেফ’
৩. রবির অফিসিয়াল ওয়েবসাইট ও ফেসবুক পেইজ।
৪. মোস্তফা সরয়ার ফারুকী, সান কমিউনিকেশন ও তানভীর হোসেনের ফেসবুক পেইজ।
৫. ইউটিউব
৬. গদ্যে ব্যবহৃত সকল ছবি, ইন্টারনেট ও ফেসবুক আর ভিডিও সংগ্রহ করা হয়েছে ইউটিউব থেকে।

Share.

About Author

টিম ওয়াটারমেলন

। ক্রেজি, ক্র্যাকড ও ক্রিয়েটিভ একদল তরুণের গ্যারেজ।

Leave A Reply

error: Content is protected !!