নাখালপাড়া অথবা ভিজ্যুয়াল কৌমের স্টোরিটেলার সম্পর্কে যতটুকু জানি

Google+ Pinterest LinkedIn Tumblr +

ফারুকী এখন আর কোনো নাম নয়। দিনে দিনে এই বিশেষ্যটি একটি প্রতিষ্ঠানে রূপ নিয়েছে। কী তার নাটক, সিনেমা অথবা বিজ্ঞাপন! যেখানেই ফারুকী তার ম্যাজিক স্পর্শ রেখেছেন সেখানেই সোনা ফুটেছে। মেদহীন শরীরের শ্মশ্রুমণ্ডিত এই লোকের হাতে এমনই জাদুর কাঠি। স্পর্শমাত্রই সবকিছুকে যা ব্যঙময় করে তোলেন। এভাবেই প্রকাশভঙ্গী, বিষয়, ভাষা ও ক্যামেরার ব্যবহার– প্রতিটি স্পেসেই, প্রতিটি ফর্মেটে ফারুকী রেখেছেন তার প্রবল সিগনেচার!

যখন ব্যাচেলর বানিয়েছেন, তাও হিট হয়েছে। যখন ক্যারাম বানিয়েছেন, সেটাও তরুণদের মাঝে ভয়াবহ রকমের জনপ্রিয় হয়েছে। ভিজ্যুয়াল দুনিয়ায় আমাদের সামনে এর আগে কেবল দুটিই প্রতিষ্ঠান ছিলো– একটি ইত্যাদি ও অন্যটি হুমায়ুন আহমেদ। এর বাইরেও যে আর কোনো কারিগর থাকতে পারে, সেটাই যখন আমরা ভুলতে বসেছি, তখনি ফারুকী তার হালকা স্বরের হালকা চালের দাবার চালগুলো দিচ্ছেন। আর রাতারাতি প্রতিষ্ঠিত অনেক ফর্ম ভেঙে গুড়িয়ে দিচ্ছিলেন।

…ফারুকী একাই বোধকরি,
অ্যাডমার্কেটে নিজের জায়গাটা
নিজের মতো করে
বানিয়ে নিলেন। একার
অধিনায়কত্বে!…

এরপর যখন তিনি অ্যাডমার্কেটে এলেন, সেখানেও আসলে তছনছ হয়ে গেলো পুরানো অনেক কিছু। অভিজ্ঞতা যতটুকু বলে, ফারুকী অ্যাডমার্কেটে ঢুকার আগেই ইন্ডিয়ান অ্যাডমেকারদের দাপট ফুরিয়ে গিয়েছিল। তখন অমিতাভ রেজাদের যুগ শুরু হয়েছে। অমিতাভ রেজা বা আরো অনেকের কাজ বাদে বাংলাদেশি অ্যাড মানে তখনো জিঙ্গেল। অথবা জোর করে হাস্যরস করে একটা কিছু বলার চেষ্টা করা।  সেই জায়গা থেকে ফারুকী একাই বোধকরি, অ্যাডমার্কেটে নিজের জায়গাটা নিজের মতো করে বানিয়ে নিলেন। একার অধিনায়কত্বে!

ফারুকী ম্যাড়ম্যাড়ে ইমোশনের জায়গায় স্থাপন করলেন পারফেকশান, তীক্ষ্ণ ও তীব্র হিউমার আর ইউনিক আইডিয়া। সঙ্গে রইল ক্যামেরার দুর্দান্ত কাজ আর একদম নিজস্ব স্টোরিটেলিং ভঙ্গি।

ফারুকীর  বিজ্ঞাপনের গল্পে আমরা প্রথম দেখলাম, খন্দকার বাড়ির মেয়ের সাথে শিকদার বাড়ির প্রেমের গল্প,  জিপি স্টাডিলাইনের চাচা ও ভাস্তের গল্প, ঢাকা ডাইরেক্ট ২০ টাকা, প্যাসেন্জার আর মালের ভাড়া, হাঁস আর বাঁশের পার্থক্য নিয়ে গল্প, নওশাদ সাহেব আর তার বস। শুধু এগুলোই নয়, প্রায় প্রতিটি অ্যাডেই তিনি যে গল্প নিয়ে হাজির হোন, সেটাতে এ শহরের গল্প থাকল। এ দেশের মানুষের নিজের গল্পটা থাকল।

এ প্রসঙ্গে ফারুকী এক টিভি ইন্টারভিউতে বলেন, “সব সময় আমি বলি যে, আমি হলাম গিয়া মেইড ইন নাখালপাড়া। নাখালপাড়ায় কমিউনিটি বিষয়টা ছিল। আমি ছোটোবেলায় দেখেছি, এক বাসার জানালা থেকে তরকারির বাটি আরেক বাসার জানালায় চলে গেল। আবার ওই বাসা থেকে তরকারি এই বাসায় চলে আসলো। এই যে জিনিসগুলা, এই যে ইউনিটি ফিলিং, এই যে আমার বাসার রান্না করা জিনিসের মালিকও তুমি হতে পারো। আমার সুখ দুঃখের মালিকও তুমি হতে পারো! অংশীদারও হতে পারো। এটার মধ্যে আমি নাখালপাড়ায় বড় হয়েছি। আমার মনে হয় আমার কাজের মধ্যে এটার রিফ্লেকশন থাকে।”

০২

গ্রামীণফোনের মা নিয়ে টিভিসির কথা মনে আছে আমাদের। সে কি বিখ্যাত সেই টিভিসি! শুধুমাত্র একটা টিভিসি নয়, এটা যেন আবেগী বাংলার এক গল্প হয়ে উঠল। ঢাকা শহরে থাকা ছেলে, ছুটিতে মায়ের কাছে ফিরছে, লঞ্চে করে। সেই লঞ্চে আবার গিটার বাজিয়ে গান করছে একদল তরুণ। ‘পথের ক্লান্তি ভুলে/ স্নেহভরা কোলে তব মাগো/ বলো কবে শীতল হবো…’ মায়ের জন্য উপহার নিয়ে যাচ্ছে ছেলে। উপহারটা একটা মোবাইল। মায়ের যখন ইচ্ছে, তখন কথা হবে। আর শেষ বাক্যটা হলো, ‘যত দূরে যাই না কেন, মায়ের কাছে তো থাকা হবে!’

এই টিভিসির প্রচারের পর, গ্রাম-বাংলার দামাল ছেলেদের যারা কর্মসূত্রে বাড়ির বাইরে থাকেন, তারা যে কেঁদেছেন– এটাও সত্য।

এরপর আরো কত টিভিসি, একাধারে, গ্রামীণ, একটেল অধুনা রবি, বাংলালিংক।  আরো কত গ্রুপের। আর প্রতিটি টিভিসিতেই এক নতুন ফারুকী। দুর্দান্ত আইডিয়া, হিউমার। কখনো বা তিনি বলছেন, নাকে তেল দিয়ে ঘুমা, কখনো বা সৎ পাত্রে জমি দানের জন্য বলছেন, কখনো বা নকিয়া ডুয়েল সীমের টিভিসি বানাচ্ছেন। এজেন্সি  ও ক্লায়েন্ট আলাদা হবার পরেও, টিভিসির মূল সুরটা ফারুকীর নিজের। মনে হয়, গল্পটাও ফারুকীর জমিনে তৈরি হওয়া, চাষবাসও তার করা!

…ফারুকীর প্রতিটি টিভিসিও
দেখি, তার নাটক বা সিনেমার
মতো একটা কৌমের
কথা বলে। যে
কৌম ইউটেপিয়া
নয়…

ফারুকীর প্রতিটি টিভিসিও দেখি, তার নাটক বা সিনেমার মতো একটা কৌমের কথা বলে। যে কৌম ইউটেপিয়া নয়। বাস্তবতার কৌম। একটা পাড়া বা মহল্লার গল্প। শুধু দৃশ্যের সৌন্দর্য নয়! সঙ্গে গল্প। এই ঢাকা শহরের গল্প। ঢাকার কৌমভিত্তিক জীবনযাপনের গল্প। যেখানে ফারুকীর বলা বা দেখা সোসাইটি বা নাখালপাড়া জায়মান থাকে! ফারুকীর মূল প্রবণতা এই যে, সে প্রথাগত ইউটোপিয়ান কোনো একরৈখিক গল্পের ভিতর দিয়ে পণ্যের প্রচার করে না! তিনি শুধু দৃশ্যের সৌন্দর্য গড়ে নকল কোনো সুপারমল বানান না!

ফারুকী বরং পণ্যের বিজ্ঞাপন করার জন্য তিনি জটিল মধ্যবিত্তকে বেছে নেন। তার রিচ্যুয়াল ও স্বপ্নকে বেছে নেন। ফলে, পণ্যটি হিউমার ও ফানের ভিতর দিয়ে অনেক মানুষের স্মৃতি ও সত্তার সাথে অধিক সংযুক্ত হয়। অথবা হৃদয়ের গভীরে স্থাপন করা এক ফসিল তুলে আনেন। যেখানে তার পরিবার থাকে। ফলে ফারুকীর টিভিসি দর্শক বা কনজিউমারের যাপনের নিকটতর হয়ে ওঠে। এ কারণেই ফারুকীর বিজ্ঞাপনও তার নাটক বা সিনেমার মতো ঝলসে ওঠে। ক্লিক করে। জনপ্রিয় হয়। পণ্যের মার্কেট বাড়ে।

দৃশ্যত পাড়া বা মোড়ের
যৎকিঞ্চিত গল্পের ভিতর
দিয়ে, ফারুকী টিভিসির ছদ্মবেশে
যে গল্প  ফাঁদেন, তা আসলে
৩০/৪০ বা ৬০ সেকেন্ডের
মামলা থাকে না…

এছাড়াও কৌমের যে গল্প ফারুকী বলেন, সেখানে আসলে অনেকের গল্প থাকে [একের না]। এক সাথে গলাগলি করে থাকা বা বাঁচার গল্প থাকে। হাস্যরস, কৌতুক, মজা থাকে! জিতে যাওয়া, হেরে যাওয়া থাকে। ব্যক্তি এখানে একক নয়, আর ব্যক্তি যখন বহুর কথা বলে, তখন এর ভিতরে যে সম্পর্ক জমে ওঠে, সেখানে সরের মত দানা বাঁধে ইমোশন। আর এই ইমোশনই পণ্যের সাথে কনজিউমারের যোগাযোগ গড়ে তোলে! এর ফলে, দৃশ্যত পাড়া বা মোড়ের যৎকিঞ্চিত গল্পের ভিতর দিয়ে, ফারুকী টিভিসির ছদ্মবেশে যে গল্প  ফাঁদেন, তা আসলে ৩০/৪০ বা ৬০ সেকেন্ডের মামলা থাকে না। সাথে সাথেই ফুরিয়ে যায় না। টিভিসির অন এয়ারটাইম হয়তো ফুরিয়ে যায়, ক্যাম্পেইন বদলে হয়তো নতুন ক্যাম্পেইন আসে, কোম্পানিও হয়তো ব্যবসা গুটিয়ে চলে যায়, কিন্তু ইউটিউবে ভাসমান তার যে বিজ্ঞাপনগুলো থাকে, সেখানে, ফারুকীর বলা একটা গল্প বা গল্পের ভিতর থাকা কৌম থেকে যায়। তার আশা আকাঙ্ক্ষা, মায়ার এসেন্স থেকে যায়! আর এভাবেই, ফারুকীর হাতে পণ্যের বিজ্ঞাপন প্রচার আরো ফলপ্রসূ হয়ে ওঠে; আর টিভি বা অনলাইনের ঘুরতে থাকা বা নুন আনতে পান্তা ফুরিয়ে যাওয়া নিয়ে চিন্তিত আমাদের মতো আমজনতার কাছে, ফারুকী লিজেন্ড বা গ্রেট বা জাদুকর হয়ে উঠতে থাকেন!

Share.

About Author

টিম ওয়াটারমেলন

। ক্রেজি, ক্র্যাকড ও ক্রিয়েটিভ একদল তরুণের গ্যারেজ।

Leave A Reply

error: Content is protected !!