ইনতেখাব আলমের ইন্টারভিউ : স্বাধীনতা টিম নভেলটিকে আরও দায়িত্বশীল ও সৃজনশীল করে তুলেছে

Google+ Pinterest LinkedIn Tumblr +

যে কোনো উদ্যোক্তার জন্য সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং বিষয়টা হচ্ছে প্রথম পাঁচটা কাজের অর্ডার কনফার্ম করা


ইনতেখাব আলম। নোভেলটি ইঞ্জিনিয়ারিং কর্পোরেশনের ফাউন্ডার ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক। মূলত ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার। পড়ালেখা করেছেন চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্বদ্যিালয়ে। চাকরি করেছেন খ্যাতনামা প্রতিষ্ঠানে। তারপর সব ছেড়েছুড়ে, রায়হান রকিবকে সঙ্গে নিয়ে,  দুইবন্ধু মিলে শুরু করলেন নোভেলটি ইঞ্জিনিয়ারিং কর্পোরেশন। এরপর কেটে গেছে ৫ বছরের অধিক সময়। এর মধ্যে প্রকৌশল খাতে ইঞ্জিনিয়ারিং সার্ভিস প্রভাইডার হিসাবে কুড়িয়েছেন সুনাম। সার্ভিস দিয়েছেন  ২০০-এর অধিক প্রতিষ্ঠানকে। একদম শূন্য হাতে শুরু করা প্রতিষ্ঠানটি আজ তাদের ব্যবসা প্রসার করতে চাচ্ছে দেশের বাইরেও। টিম ওয়াটারমেলন এই তরুণের সাথে কথা বলার জন্য অনেকদিন চেষ্টা করার পর, তার সায় পাওয়া গেছে। মিতবাক এই তরুণ এন্ট্রাপ্রেনারের ইন্টারভিউটি এক স্বপ্নবাজের পৃথিবী জয়ের আকাঙ্ক্ষার বার্তাই যেন তুলে ধরে আমাদের সামনে। তাইলে প্রিয় আসুন…  

কেমন আছেন?

ভালো।

ব্যবসার অনুপ্রেরণা কোথা থেকে পেলেন?

ব্যবসা করব– এটা আমি ইউনিভার্সিটিতে থাকাকালেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। আর পড়ালেখা শেষে, জব করেছি শুধু অভিজ্ঞতার জন্য। জব শুরুর পর, প্রথম বসকে একদিন কথা প্রসঙ্গে বলেছিলাম, আগামী ১০ বছরের ভেতর আমি ব্যবসা শুরু করব। কিন্তু তখন পর্যন্ত জানতাম না, ব্যবসার ধরন কী হবে? বা কোন প্রোডাক্ট নিয়ে আমি কাজ করব!

আমার ২য় চাকরিটা ছিল একটা মাল্টিন্যাশনাল ফার্মে। আমার চিন্তার জগতটাকে বড় করে দেয় এই চাকরি। ওখানকার অভিজ্ঞতা থেকে আমি সমৃদ্ধ হবার সুযোগ পেয়েছি। আর এই জব করতে করতেই, কনফিডেন্স লেভেলটা বাড়ল,  একটা সময় মনে হলো, এখন শুরু করা যায় । তারপর একদিন হঠাৎ করেই  রিজাইন লেটার দিয়ে দিলাম।

আরেকটা বিষয় ছিল যে, আমার বাবা সরকারি চাকরি করতেন। আর সরকারি চাকরিজীবীর আয় ও পারিবারিক অবস্থার কারণে আমি  সরকারি চাকরির প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলি এবং ব্যবসার প্রতি প্রভাবিত হই।

ব্যবসার শুরুতে সবচে চ্যালেঞ্জিং কি ছিল আপনার জন্য?

লজিক্যাল মোটিভেশনটা কারও কাছ থেকে সেভাবে পাইনি আমি । কেননা, আমার ফ্যামিলির কেউ কোনোদিন ব্যবসা করেনি। এছাড়া আমি জানতামও না, ক্লায়েন্ট কীভাবে জোগাড় করতে হয়। তারপরও, ব্যবসা শুরু করার প্রথমদিকে মনে হতো, একটু তাড়াতাড়িই হয়ে গেল কিনা? আরেকটা চ্যালেঞ্জ ছিল, খুব ভালো একটা জব ছেড়ে দেয়া। খুব অসাধারণ একটা জব ছেড়ে দিয়ে যখন ব্যবসা শুরু করলাম, বাড়ির সবাই একটু অবাক-ই হয়েছিল।

আমার কাছে মনে হয় কি, যে কোনো উদ্যোক্তার জন্য সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং বিষয়টা হচ্ছে প্রথম পাঁচটা কাজের অর্ডার কনফার্ম করা । কেননা ওই সময়টায় মার্কেটে আপনি একেবারেই আনকোড়া, নতুন। আপনাকে কাজ দেয়া মানে একটা রিস্কি বিষয় হ্যান্ডেল করা। নিজেকেও রিস্কি একটা জায়গায় নিয়ে যাওয়া।  সঙ্গত কারণেই এই রিস্ক আপনার অনেক কাছের বন্ধুও নিতে পারবে না।

তবে, আমার বিশ্বাস ছিল কিছু একটা সুযোগ পেয়ে যাব। তো এভাবে হঠাৎ এক স্কুল ফ্রেন্ড একটা কাজের জন্য রেফার করল! পেট্রোল পাম্প মেইনটেইন্সের কাজ। কাজটা পেয়েও গেলাম। আর এভাবেই শুরু হয়ে গেল। এছাড়াও কাজের জন্য যখন এই অফিস ওই অফিসে ঢুঁ মারতাম, রেসপন্স করতো সবাই, কিন্তু আস্থা রাখতে পারত না। অনেকেই ব্যাকগ্রাউন্ড যাচাই করত। কাজের প্রোফাইল দেখতে চাইত। ব্যবসার শুরুতেই আস্থার স্পেসটা ক্রিয়েট করাটাই, একটু কঠিন ছিল আরকি!

তারপর, পেট্রোল পাম্পের কাজের পর?

এরপর এক সপ্তাহের গ্যাপেই আরও একটা কাজ পেলাম। এইভাবে চলতে লাগল!

তখন আপনার অফিস ছিল কোথায়?

প্রথম দিন থেকেই অফিস নিয়ে শুরু করেছি আমি। উত্তরায় একটা ফ্ল্যাটে এক রুমের অফিস। প্রথমদিকে আমার কোনো স্টাফ ছিল না। আমি একাই কোটেশন রেডি করতাম। ক্লায়েন্টের কাছে যেতাম। । নিজেই কোম্পানির লোগো, প্যাড, ভিসিটিং কার্ড ডিজাইন করেছিলাম। এইভাবে প্রায় এক বছর কেটে গেল! তারপর আমার ব্যবসায়িক পার্টনার তার জব ছেড়ে পুরদমে কাজ শুরু করল।

নোভেলটি ইঞ্জিনিয়ারিং কর্পোরেশনের মোড় ঘোরার কাজ কোনটি? বা কোন কাজের পর আর পিছু ফিরে তাকাতে হয়নি আপনাকে?

চট্টগ্রাম ইপিজেডের একটি ফরেন ইনভেস্টেড কারখানায়। ২০১৩ সালে। আরএমজি  সেক্টরে ওটাই ছিল আমাদের প্রথম কাজ। এরপর আসলে আর পিছু ফিরে তাকাতে হয়নি।

নোভেলটির জন্য সবচে চ্যালেঞ্জিং কাজ ছিল কোনগুলো? কেন?

গত পাঁচ বছরে আমরা ২০০টিরও বেশি প্রতিষ্ঠানকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে ইঞ্জিনিয়ারিং সার্ভিস দিয়েছি। এতগুলো প্রতিষ্ঠানের কাছে নিজেদের উপস্থাপন করা এবং কাজটা কনফার্ম করা– আমার মনে হয়, এটাই সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং ছিল আমাদের জন্য। আমাদের বেশিরভাগ কাজই ইঞ্জিনিয়ারিং কমপ্লায়েন্স রিলেটেড।

তবে আমার মনে হয়কি, সবচে গুরুত্বপূর্ণ ও চ্যালেঞ্জিং বিষয় ছিল, এমন পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে একটা মোটিভেটেড টিম টাইমলি কাজগুলো সফলভাবে সম্পন্ন করবে।

আপনার ভবিষ্যত প্ল্যান কি? নতুন কোনো স্টার্টআপের কথা ভাবছেন কিনা?

প্রথমে আমাদের সারভাইভ করতেই চলে যায় প্রায় দুই বছর। আর ওই সময়টা পার করবার পরই  আমাদের ভ্যালুগুলো কনফার্ম করি আমরা। এরই ধারাবাহিকতায় আমরা আমাদের গোলও সেট করি। আমাদের প্লানগুলোকে ৩টি ভাগে ভাগ করেছিলাম। তিনটি ভাগ ছিল : লং টার্ম [২০৩৫], মিড টার্ম [২০২৫] এবং শর্ট টার্ম [২০১৮]। এখন পর্যন্ত আমরা শর্ট টার্ম প্লান সাকসেসফুলি এক্সিকিউশন করতে সক্ষম হয়েছি এবং হচ্ছি।

যদিও মিড টার্ম এবং লং টার্ম-এর স্ট্র্যাটেজিক প্রস্তুতি এখনও সম্পন্ন হয়নি। আমরা আমাদের ভিশনকে মাঝখানে রেখে সাতটি সেক্টর সিলেক্ট করেছি। এগুলো হলো–
১. ইঞ্জিনিয়ারিং
২. হেলথ কেয়ার
৩. এনার্জি অ্যান্ড এনভাইরনমেন্ট
৪. কালচার
৫. এডুকেশন
৬.  অ্যাগ্রিকালচার
৭. টেকনোলজি ।

–এই ৭টি সেক্টরের মধ্যে ‘ইঞ্জিনিয়ারিং’-এ পুরুদমে কাজ চলছে আর ‘এনার্জি অ্যান্ড এনভাইরনমেন্ট’-এ কাজ শুরু হয়েছে। পর্যায়ক্রমে বাকি সেক্টরগুলোতে কাজ শুরু হবে।

নোভেলটির এখনকার চ্যালেঞ্জ কী?

আমরা আমাদের ব্যবসায়িক কার্যক্রম দেশের বাইরে সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত নিয়েছি এবং পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ শুরু করে দিয়েছি। ভিন্ন দেশে নতুন করে ব্যবসা শুরু করাটাকে একটু চ্যালেঞ্জিং মনে হচ্ছে।

 নোভেলটির ম্যানেজমেন্ট পলিসি সম্পর্কে বলুন?

আমরা আমাদের ভিশন অনেক সময় নিয়ে, চিন্তা করে সেট করেছি। সবসময় চেষ্টা করেছি যেন আমাদের সেট করা পলিসিতে ভিশনের ছাপ থাকে। তবে আমাদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও দুর্দান্ত পলিসি ছিল, টিমের সবাইকে প্রচুর  এনপাওয়ারড করা এবং কাজের একটা আরামদায়ক পরিবেশ তৈরি করা।

আমি দেখেছি, এটা কাজ করেছে। আরও দেখেছি, স্বাধীনতা– টিম নভেলটিকে আরও দায়িত্বশীল এবং সৃজনশীল করে তুলেছে ।

নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য আপনার উপদেশ কী?

স্বপ্ন থাকতেই হবে। ধৈর্য নিয়ে লেগে থাকতে হবে। প্রচণ্ড পরিশ্রম করতে হবে। আর সবসময় নতুন কিছু শিখবার মধ্য দিয়ে যেতে হবে।

আরেকটা বিষয়, ভূগোলভেদে উদ্যোক্তার ইনভায়রমেন্ট কিন্তু স্বতন্ত্র। অনেককেই দেখি পশ্চিমাবিশ্বের সফল উদ্যোক্তাদের অনুসরণের চেষ্টা করে। আমি বলি কি, পশ্চিম নয়, নিজের দেশের দিকে তাকিয়েই শুরু করতে হবে। কেননা, এখানকার সামগ্রিক পরিবেশ আর চ্যালেঞ্জ, পশ্চিমের মতো নয়। অনেক পার্থক্য আছে।

কোন কোন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে বা  কী বিষয়ে আপনি সবসময় আপডেট থাকতে চান? 

বেশ কয়েকটা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে নিজেকে রেগুলার আপডেট রাখি আমি। ইদানিং ক্রিপ্টো কারেন্সি‘র উপর একটু বেশি খেয়াল রাখছি। বিশ্ব থেকে একসময় ফিজিক্যাল কারেন্সি উঠে যাবে, চলে আসবে ভার্চুয়াল কারেন্সি। আমাদের জেনারেশন সম্ভবত এই পুরো প্রসেসটার মধ্যে দিয়ে যাবে। এছাড়াও বিজনেস ইনসাইডার-এর ওয়েব রেগুলার ফলো করি।

কিছুটা ব্যক্তিগত

কবিতা পড়েন কখনো? 

কবিতা পড়া হয় মাঝে-সাঝে। রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ, হেলাল হাফিজ , শামসুর রাহমানের কবিতা পড়ে আনন্দ পাই।

রূপকথা পড়েন কি? প্রিয় রূপকথা কোনটি?

রূপকথা পড়া হয় না। ৭১-এর ইতিহাস নিয়ে পড়তে বেশ আগ্রহ পাই।

আপনার প্রিয় শখ?

গান শোনা

প্রিয় গান?

মেঘদলের নির্বাণ, ওয়ারফেজের সময়, কালিকাপ্রসাদের কণ্ঠে, ‘বন্ধু তোর লাইগা রে’ আর রবীন্দ্রসঙ্গীত!

ঘুরতে ভাল্লাগে?

অবশ্যই।

একজীবনে কোথায় চলে যেতে পারলে খুশি হতেন বলে মনে হয়?

আয়ারল্যান্ড। তবে থাকার জন্য না, ট্যুরের জন্য!

কী করতেন আয়ারল্যান্ডে গিয়ে?

কিছুই না। খালি ঘুরতাম। একটা মুভিতে  দেখে দেশটার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের প্রতি প্রেমে পড়ে গেছি।

শৈশব কোথায় কেটেছে আপনার?

চট্টগ্রামে।

কেমন ছিল শৈশব?

খুব সাদামাটা।

কোনো আনন্দের স্মৃতি!

নানাবাড়ি বেড়াতে যাওয়া। একবার ঈদের ছুটিতে বেড়াতে গিয়ে পাশের বাড়ির জানালা, পর্দা পুড়িয়ে ফেলেছিলাম, পটকা ফোটাতে গিয়ে!

পাহাড় না নদী– কোনটা টানে বেশি!

নদী।

কেন?

কেন যে? এটা তো আসলে ভাবিনি!

প্রিয় রঙ কী আপনার?

সবুজ আর শাদা রঙ।

কেন?

কেন যে? এটা তো আসলে ভাবিনি! হা হা হা…!

নিজের সবচে বিরক্তিকর অভ্যাস?

সকাল-সকাল ঘুম থেকে না উঠতে পারা!

নিজের সবচে ভালো অভ্যাস?

প্রচুর পরিশ্রম করতে পারি।

প্রিয় ফিল্ম?

টুয়েলভ অ্যাংরি ম্যান।

স্বপ্ন দেখেন?

অবশ্যই!

স্বপ্নের সমান চান, না স্বপ্নের চে বেশি পাওয়ার প্রত্যাশা করেন?

নিজের বেলায় স্বপ্নের সমান পেলেই খুশি। কিন্তু দেশের বেলোয় স্বপ্নের চে অনেক বেশি কিছু চাই।

আপনাকে ধন্যবাদ

অাপনাকেও!

Share.

About Author

টিম ওয়াটারমেলন

। ক্রেজি, ক্র্যাকড ও ক্রিয়েটিভ একদল তরুণের গ্যারেজ।

Comments are closed.

error: Content is protected !!