পীযূষ পাণ্ডের ইন্টারভিউ : গ্রেট কিছু করো! পুরস্কার এমনিই আসবে

Google+ Pinterest LinkedIn Tumblr +

ইন্ডিয়ান অ্যাড মার্কেটের বিখ্যাত জেনারেল– পীযূষ পাণ্ডে। ফেভিকলের অ্যাড ছাড়াও আরো অনেক জনপ্রিয়  কাজ তার রয়েছে। এমনকি, ২০১৪ সালের ভারতীয় নির্বাচনে, বিজেপির ক্যাম্পেইনেরও মাস্টারমাইন্ড এই গোঁফওয়ালা ভদ্রলোক। পাণ্ডেমোনিয়াম বইয়ের প্রকাশনা অনুষ্ঠানের প্রাক্কালে, এই ইন্টারভিউটি নেন, প্রদ্যূমান মহেশ্বরী। পাণ্ডে এই ইন্টারভিউতে, তার শৈশব, পরিবার, ক্রিকেট ও তার ওপর আরো নানানকিছুর প্রভাব সম্পর্কে অকপট কথা বলেছেন। এই বিখ্যাত অ্যাডম্যানকে বুঝতে, এই  ইন্টারভিউটি কাজে লাগতে পারে ভেবেই ওয়াটারমেলন অ্যান্ড আদার্স-এর পাঠকদের জন্য এটি অনুবাদটি  করেছে টিম ওয়াটারমেলন


‘পান্ডেমোনিয়াম’ পড়ে মনে হলো, আপনি অনেক ইমোশনাল মানুষ।

আমি অনেকবার কেঁদেছি, এই বইটা লেখার সময়। কিছু স্মরণীয় জিনিস আমাকে কাঁদিয়েছে। বইটাতে অনেক আনন্দের বিষয় আছে, তেমনি আছে ইমোশনাল বিষয়। আর আমি ওই মানুষ, যে, মানুষের সামনে কাঁদতে লজ্জা পায় না!  আসলে চোখ থেকেই তো কান্না জন্মায়, আর ৯৯ ভাগ সময়েই এই কান্না আসে উল্লাস  অথবা নস্টালজিয়া হতে।

বলেছেন, নিজ পরিবারকে আপনি ক্রিয়েটিভ ফ্যাক্টরি ভাবেন! বাবার কাছ হতেই শিখেছেন আপনি, জটিল [মানুষ বুঝতে পারে না– এ রকম] আবৃত্তিযোগ্য কবিতার বদলে সহজ কবিতা লেখা। আপনার বিজ্ঞাপন সহজ ও ভূমিলগ্ন, এর মূল বীজটা কি এভাবেই পাওয়া?

হ্যাঁ,  সহজ ও অনাড়ম্বর যোগাযোগ আমরা পরিবার থেকেই শিখেছিলাম। কিন্তু তোমাকে আসলে  অডিয়েন্সের কথা ভাবতে হবে। দেখো, আমি হিন্দি ভালোই পারি, কিন্তু এখনো হিন্দি ব্যবহার করি না। কেননা, আমার আসল শ্রোতারা হিন্দি ব্যবহার করে না। ফলে চল মেরি লুনা অথবা অন্য যে কোনো কাজের কথা যদি বলো, সেটা আসলে জীবন থেকে উঠে আসা খুব সাধারণ জিনিস! আর শোনো, মানুষের বলার ভঙ্গীতে আমি বিশ্বাস করি বলেই, নিজেও ওই রকম করে লিখতে চাই!

আজকের দিনে বিজ্ঞাপনের ওপর অনেক প্রত্যাশা কাজ করে। এ কারণে মার্কেটারদের অনেক রিসার্চ করতে হয়। তাদেরকে নানান ধরণের প্রত্যাশার চাপও সামাল দিতে হয়। এত চাপ ও প্রত্যাশার ভিতর থেকে, একজন মার্কেটারের পক্ষে নিজের কথাগুলো সহজ করে বলাটা কি আদৌ সম্ভব বলে মনে করেন?

আমি মনে করি, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই তোমার কাজটা শেষ করতে হবে। কিন্তু আমি তাই করি, ক্লায়েন্ট যা চায়। ক্লায়েন্টরা ডিমান্ড করতে পারে, ম্যাসেজটা যেন এইভাবে বা ওইভাবে বলি; কিন্তু প্রফেশনাল হিসাবে আমি মনে করি, কখনো কখনও ৩০ সেকেন্ডের মধ্যে যে সবকথা তোমার পক্ষে বলা সম্ভব নয়, সেটা তাদেরকে বোঝানোর জন্য চেষ্টা করা! আর যারা তোমার কথা বুঝতে পারে, তাদের সাথে গ্রেট কোনো কাজ করো!

‘পান্ডেমোনিয়াম’ পড়লে বোঝা যায়, আপনি রিসার্চ পছন্দ করেন না। কিন্তু বেশির ভাগ মার্কেটারই রিসার্চ পছন্দ করে। রিসার্চ ছাড়া আপনার কাজের পদ্ধতিটা কী?

মিকি মাউস টাইপের রিসার্চ আমি পছন্দ করি না। বিশ্বাসও করি না। যখন আমি একজন মুচি, ছুতার, ড্রাইভার বা নাপিতের সাথে কথা বলি, তখন কি রিসার্চ করি না? আমি আসলে কাউকে বুঝতে না দিয়েই এই কাজটা করি। এখন তুমি যদি একটা  শর্তসাপেক্ষ দৃশ্যের ভিতরে থাকো, তাইলে উত্তর আকারে ওই শর্তটাই তুমি পাবে। আমি এই টাইপের উত্তর অপছন্দ করি। কেননা এইসব উত্তর উপরিতলের খেলা।

তুমি আমার কাছে কী শুনতে চাও, বলো? ভাবো, আমাকে রিসার্চ করার মানে যদি এই হয় যে, শুধু আমার সাথে কথা বলা বা নাগেট খেতে বাইরে যাওয়া– তাইলে বলো অসতর্ক আমিটা কই?

আপনি মুচি ও ছুতারের কথা উল্লেখ করেছেন। আপনার জীবনে অনেকের ইনফ্লুয়েন্সের কথাই লিখেছেন। আপনি তাদেরকে কীভাবে নিজের বিজ্ঞাপনে ব্যবহার করেছেন?

আমার বিজ্ঞাপনগুলোর মধ্যে নাপিত নিয়ে ৬টি কাজ অন্তত পাবে। নাপিতেরা সাধারণত সদালাপী হয় খুব। তারা অনেকের সাথে কথা বলে। তাদের কাছে অনেক তথ্যও থাকে।  নাপিতদের সাথে আমি কথা বলি সবসময়। মুচি ও ছুতারদের কথা বলেছি, কীভাবে তারা আমাদের বাড়িতে কাজ করত, কীভাবে তাদের সাথে আমি কথা বলতাম। দেখো আমি আসলে পিডিলিট আর ছুতারদের সাথে ৩৩ বছর কাজ করেছি। ফলে এইটা আমার কাছে খুব সহজ একটা হাতের কাজ মনে হয়।

আপনি ট্রেন জার্নি ও অন্যান্য ইনফ্লুয়েন্স নিয়েও কথা বলেছেন…

ট্রেন জার্নিগুলো আমার সবচে দামি সোর্স! আমরা সাধারণত ২য় শ্রেণির কম্পার্টমেন্টে চড়তে পছন্দ করতাম। অনেক মানুষ সেখানে থাকে, কথা বলে। বইয়ে দেখবে, আমি লিখেছি– কখন কীভাবে ট্রাভেলিং করতে হয়, জার্নিতে জনগণ তাদের খাদ্য ও গল্প ভাগ করে খায়, কোনো রকম ভয়-টয় ছাড়াই, কেননা তারা জানে, একবার যে যার স্টেশনে নেমে যাবার পর, আর কোনোদিন দেখা হবে না! ফলে তারা তাদের শ্বাশুড়ির চরিত্র নিয়েও গালিগালাজ করতে পারে নিঃসঙ্কোচে।

‘পাণ্ডেমোনিয়াম’-এ, আপনি আপনার বিশাল বড় পরিবার, বাবা-মা ও ভাই-বোন ও তাদের প্রভাব নিয়ে লিখেছেন। তবে আপনার উপর সবচে বেশি প্রভাব বোধহয় ফেলেছে বড়ভাই…

তুমি যদি দেখো, ২০ বছরের বেশি সময় ধরে এই ইন্ড্রাস্ট্রিতে কাজ করছি আমি। আমরা একই সাথে কাজ করছি। এমনকি শৈশবেও, সে অনেক ক্রিয়েটিভ ছিল। আমার ভাই, শিশুভাইটির চে বড়বন্ধু। আমরা অসংখ্য অ্যাডে একসাথে কাজ করেছি। সেগুলো দুর্দান্তও হয়েছে।

আপনার অনেক অসাধারণ কাজের  ভিতর কোন কাজটি ক্যারিয়ারের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে বলে মনে করেন?

ক্লায়েন্ট সার্ভিস থেকে ক্রিয়েটিভ সেকশনে আসার পর, লুনা ছিলো আমার প্রথম কাজ। তারপর ফেভিকল, আর ক্যাডবেরির ‘কুচ খাস হেই হাম সাব মেইন’ কাজ দুটি। আমার ক্যারিয়ার ঘুরিয়ে দিয়েছে এগুলো। এগুলো অনেক বড় ক্যাম্পেইন ছিল। চলেছেও অনেকদিন ধরে। কাজ দুটির পর মানুষজন ভাবল, ছেলেটি ভালো কিছু করেছে।

আপনার শুরুর সময়টাতে ইংরেজি কপিরাইটারদের দখলেই ছিল মোম্বাই অ্যাড দুনিয়া। সে সময় আমি আপনাকে নিয়ে যে আলোচনা শুনেছি, তা অনেকটা এ রকম যে– এই ছেলেটা মোম্বাই অ্যাড দুনিয়াকে মাটিতে নামিয়ে এনেছে।

হ্যাঁ, আমি প্রথম ইংরেজি কপিরাইটিংয়ের বাইরে কাজ করেছি। কিছু অসুবিধা যে হয় নাই, তা না! কিন্তু আযলিক পদমসীর মতো অন্য ঘরানার লোক, আমার কাজের প্রশংসা করেছিল। পাবলিক ফোরামে তখন, সুভাষ ঘোষাল বলেছিল যে, তক্কে তক্কে রাখো, অ্যাডভার্টাইজিংয়ের ভবিষ্যৎ এই ছেলে। আমি এতে অবশ্য তখন লজ্জা পাইছিলাম।

আপনার ওপর ক্রিকেটের প্রভাব অনেক। ক্রিকেটার হিসাবে ক্যারিয়ারটাকে আপনি বড় করেননি কেন?

আমি যখন রঞ্জিতে খেলা শুরু করি, তখন আসলে তেমন পরিশ্রম করিনি। এটাই কারণ। কিন্তু ক্রিকেট আমাকে শিখিয়েছে, প্রতিটি বলই একটা নতুন বল। শেষ ওভারে তুমি কেমন খেললা– এইটা কোনো মানেই রাখে না। আমি শিখেছি, প্রতিটি সুযোগই একটা বড় সুযোগ, আর এই সুযোগকে খুব বড় কোনো অর্জন ভাবাও উচিত না।

ক্রিকেট নিয়ে আপনার অনেক মজার কাজ রয়েছে…

এই খেলাটা নিয়ে কাজ করতে পছন্দ করি আমি। ক্রিকেট আমাকে ক্রিকেটের বাইরে গিয়েও কাজ করতে শিখিয়েছে। ক্রিকেট আমাকে টিমওয়ার্ক, নেতৃত্ব আর দুইয়ে দুইয়ে চার মেলানো শিখিয়েছে। অনেক ক্লায়েন্ট আমাকে বলে, আমি নাকি ক্রিকেট-আনালজির বাইরে একটা বাক্যও বলতে পারি না!

অ্যাডভার্টাইজিং দুনিয়ার পুরস্কারের প্রতি যে ক্রেজ, সেটা আপনার মন-পছন্দ না…

তুমি যখন শুধু পুরস্কারের দিকে তাকিয়ে থাকবে, তখন তুমি যা করতে চাও, তার প্রতি সৎ থাকতে পারবে না। এটা অনেকটা সেই ক্রিকেটারের মতো, যে ‘ম্যান অব দ্যা ম্যাচ’ হতে চায় শুধু! ‘ম্যান অব দ্যা ম্যাচ’ হওয়ার আকাঙ্ক্ষার কাছে, জিততে চাওয়ার উদ্যেশ্যটা মার খায়। সে কারণে আমি ভাবি, পুরস্কার জিততে হবে ভেবে শুরু করাটা একটা ভুল সিদ্ধান্ত। তার চে বরং গ্রেট কিছু করো! পুরস্কার এমনিই আসবে।


দোহাইঃ
১. http://www.dnaindia.com।
Share.

About Author

টিম ওয়াটারমেলন

। ক্রেজি, ক্র্যাকড ও ক্রিয়েটিভ একদল তরুণের গ্যারেজ।

Leave A Reply

error: Content is protected !!